Ajker Patrika

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

খামেনি কোথায়, কেমন আছেন—উৎকণ্ঠিত ইরানিদের প্রশ্নের বন্যা

অনলাইন ডেস্ক
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫, ১৬: ৫৯
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: খামেনির কার্যালয়
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: খামেনির কার্যালয়

ইরানজুড়ে গুঞ্জন। দেশটির রাজধানী তেহরানের ক্যাফে থেকে শুরু করে পার্লামেন্ট ভবনের করিডর—সর্বত্র সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—সর্বোচ্চ নেতা কোথায়? গত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে যুদ্ধ, হামলা, প্রতিশোধ, যুদ্ধবিরতি—সবই ঘটেছে। অথচ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দেখা নেই। নেই কোনো বার্তা। নেই কোনো ছবি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে উপস্থাপক মুখোমুখি হয়েছিলেন খামেনির দপ্তরের কর্মকর্তা মেহদি ফাজায়েলির। তাঁর কাছে উপস্থাপক সোজা প্রশ্ন করলেন, ‘মানুষ খুব উদ্বিগ্ন। সর্বোচ্চ নেতার অবস্থা কী?’ ফাজায়েলির উত্তর রহস্যে মোড়া, ‘আমার কাছেও অনেক প্রশ্ন এসেছে। আমাদের সবার দোয়া করা উচিত। যাঁরা তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন, তাঁরা ঠিকঠাক কাজ করছেন। ইনশা আল্লাহ, আমাদের মানুষ বিজয় উদ্‌যাপন করবে তাদের নেতার পাশে দাঁড়িয়ে।’

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনিই দেশের সব বড় সিদ্ধান্তের শেষ কথা বলেন। অথচ গত এক সপ্তাহে দেশের বড় বড় সংকটের মধ্যেও তিনি প্রকাশ্যে দেখা দেননি বা কোনো বক্তব্য দেননি। কয়েক দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এরপর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হয়, যা গত মঙ্গলবার সকালের দিকে কার্যকর হয়েছে।

এসব ঘটনার মধ্যেও খামেনি নিখোঁজ। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তার কারণে তিনি বাংকারে অবস্থান করছেন এবং ইলেকট্রনিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন, যাতে তাঁকে টার্গেট করে হত্যা করা না যায়। কিন্তু তাঁর এই অনুপস্থিতি সবাইকে বিস্মিত ও আতঙ্কিত করে তুলেছে।

রাজনীতি ও সামরিক অঙ্গনে চাপা গুঞ্জন—তিনি কি বেঁচে আছেন? আহত? নাকি...! ইরানের ‘খানেমান’ নামে একটি রিয়েল এস্টেটভিত্তিক দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক মোহসেন খালিফে বলেন, ‘তাঁর কয়েক দিনের অনুপস্থিতি আমাদের মতো যারা তাঁকে ভালোবাসি, তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।’ তিনি বলেন, ‘যদি খামেনি মারা যান—যা দুই সপ্তাহ আগেও অকল্পনীয় ছিল—তবে তাঁর জানাজা হবে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ ও ঐতিহাসিক।’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনির অনুমতি ছাড়া দেশ এমন বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা বা ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মতো সিদ্ধান্তের পেছনে তাঁর মতামত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, সেনা কর্মকর্তারা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনেকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না, তাঁরা সাম্প্রতিক সময়ে খামেনির সঙ্গে সরাসরি দেখা করেছেন কি না বা কথা বলেছেন কি না।

ইরানের প্রভাবশালী সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ইয়াহিয়া সাফাভির ছেলে ও সামরিক বিশ্লেষক হামজা সাফাভি বলছেন, ইসরায়েলের হাত থেকে বাঁচতে খামেনি বাংকারে। বাইরে যোগাযোগ সীমিত। কিন্তু কেউ নিশ্চিত নয়—তিনি আদৌ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না।

সাফাভি আরও বলেন, দেশের সংকট মোকাবিলায় এখন ‘বাস্তববাদী’ চিন্তাভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে। যার অর্থ, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ অন্য নেতাদের ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তারপরও অনেক খামেনি সমর্থক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন, একে-অপরকে বার্তা পাঠাচ্ছেন। বলছেন, খামেনিকে না দেখে বা না শুনে তাঁরা মনে করতে পারছেন না যে, ইরান ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে জয় লাভ করেছে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যুক্ত চার শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খামেনির অনুপস্থিতিতে রাজনীতিবিদ ও সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে—কেউ কেউ পারমাণবিক কর্মসূচি আরও এগিয়ে নিতে চায়, কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার পক্ষপাতী।

এই মুহূর্তে যে পক্ষ কিছুটা এগিয়ে আছে, তারা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও মধ্যপন্থার পক্ষে। এর নেতৃত্বে আছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, যিনি স্পষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনায় ফিরতে রাজি হয়েছেন, এমনকি ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পরও। এই শিবিরে আছেন বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-ইজেই এবং সশস্ত্র বাহিনীর নতুন প্রধান মেজর জেনারেল আবদোররহিম মুসাভি।

গতকাল বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ ও জনগণের ঐক্য ইরানের জন্য ‘শাসনব্যবস্থা ও কর্মকর্তাদের আচরণে’ পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য শাসনব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সোনালি সুযোগ।’

এদিকে ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার পর দেশজুড়ে যে জাতীয়তাবাদী আবেগ তৈরি হয়েছে, সেটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে সরকার। গত মঙ্গলবার তেহরানের ‘আজাদি স্কয়ারে’ (স্বাধীনতা স্কয়ার) জাতীয় সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা খোলা জায়গায় সংগীত পরিবেশন করে। এরপর স্কয়ারের মাঝখানের স্মৃতিস্তম্ভে আলোক প্রক্ষেপণের মাধ্যমে জরুরি উদ্ধারকর্মীদের ছবি দেখানো হয়।

তবে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় অন্য গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কট্টরপন্থী নেতা সাঈদ জলিলির নেতৃত্বাধীন একটি শক্তিশালী রক্ষণশীল গোষ্ঠী। তারা প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করছে। তারা যুদ্ধবিরতিকে ‘হঠাৎ সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে কোনো পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার কড়া বিরোধিতা করেছে।

এই গোষ্ঠীতে রয়েছেন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ রক্ষণশীলরা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কিছু জ্যেষ্ঠ কমান্ডারও। সাঈদ জলিলির ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফোয়াদ ইজাদি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘এই সময় আলোচনার কথা বললে মনে হয়, ইরানের প্রেসিডেন্টের দেশ পরিচালনার যোগ্যতা নেই।’

এ বক্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র আলি আহমাদনিয়া। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘১২ দিন ধরে আমরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়েছি। এখন যদি আপনাদের মতো লোকদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়, তাহলে সেটাও এক যুদ্ধ। আপনারা নিজেদের কলম দিয়ে শত্রুর কাজ সহজ করে দিচ্ছেন।’

ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি স্থানীয় গণমাধ্যমে বলেছেন, ইরান দ্রুত পারমাণবিক স্থাপনা পুনর্গঠন করবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।

ব্রিটিশ থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, খামেনির অনুপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এটা বোঝায় যে, ইরানের নেতারা এখন খুবই সতর্ক অবস্থানে আছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি আশুরার আগে খামেনিকে দেখতে বা শুনতে না পাই, তাহলে সেটা খুব খারাপ সংকেত হবে। তাঁকে অবশ্যই জনসমক্ষে আসতে হবে।’

আর তাই সবার নজর এখন আশুরার দিকে। সময় যত গড়াচ্ছে, রহস্য ততই ঘনীভূত হচ্ছে। খামেনি আশুরার আগেই সামনে আসবেন নাকি ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়?

আরও খবর পড়ুন:

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত