Ajker Patrika

আমরা এক কঠিন রোগে ভুগছি

আফজাল হোসেন
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৫, ২১: ৫১
আফজাল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
আফজাল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

আমরা এক কঠিন রোগে ভুগছি। রক্তে তার কারণ লেখা নেই। সে রোগ মনের। রোগ পুষতে থাকলে কী দশা হতে পারে, সবার জানা। জেনে, বুঝে রোগ লালন-পালন করতে থাকব, না নিরাময়ের কথা ভাবব?

আমরা কি ভালো কথা, ঘটনা, বিষয়ের প্রতি ততটা আকর্ষণবোধ করি, স্বাভাবিকভাবে যতটা করা উচিত? উচিত-অনুচিত নয়, উপভোগের দিকেই আমাদের মন। মন্দের বদলে মানুষের উজ্জ্বলতা, অসাধারণত্বে সহজে মুগ্ধ হতে পারতাম, কিন্তু হতে পারি না।

আজকাল ভালো, অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো বিষয়ে আমাদের মন বসে না। ভালো কিছু বলতে ও শুনতে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে। জোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে মন্দ বলা ও শোনার প্রতি। অভ‍্যাসের এই বদল আমাদের ভয়ানক মানুষে রূপান্তর করছে—টের পাই না।

দেশে অহরহ কেবল মন্দই ঘটছে, তা নয়। আনন্দের, গৌরবের, আশাজাগানিয়া কত কিছু ঘটে, ঘটছে—সেসব আমাদের মনের দরজায় এসে কড়া নাড়লে শুনেও না শোনার ভান করে থাকি, দরজা খোলার জন‍্য উঠতে ইচ্ছা করে না। সে খবর অনেকের জানা বলে আমাদের উদ্দেশে পরিবেশিত হয়ে থাকে মনবিধ্বংসী মন্দ খবর, আলোচনা, সমালোচনা।

মন্দের গন্ধে আমরা অনেকে জেগে উঠি। যা মন্দ, তার গন্ধ মনে সাড়া ফেলে দেয়, অথচ জগৎ বা এই দেশ মন্দ, খারাপে ভর্তি নয়। সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন‍্য অনেক কিছু ভালো দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন, ভালোর প্রতিই মানুষ বিশেষভাবে আগ্রহী হোক। সৃষ্টিকর্তার চাওয়ার বিপরীতে মানুষ হয়েছে উল্টো।

টেলিভিশন চ‍্যানেল আর সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমে ঢুঁ মারলে দেখা যায়, দেশ নিয়ে সাংঘাতিক সাংঘাতিক আলোচনা অনুষ্ঠান। এসবের অধিকাংশই আলোচনার চেয়ে বেশি মাত্রায় সমালোচনামূলক। অনুষ্ঠানে আলোচনা থাকে চিমটিখানেক, ধামা ভর্তি থাকে নুন, ঝাল আর মসলা মাখানো সমালোচনা, মন্দ কথা। থাকে—কারণ, মন ভরে আমরা অনেকে ওসবই খেতে পছন্দ করি। রোজ আগ্রহ নিয়ে মানুষ এসব দেখতে বসে এবং রোজই ধারণা পাওয়া হয়, দেশ রসাতলে যাচ্ছে। জানা হয়, ভালো কিছু, আশা করার মতো কিছু ঘটছেই না দেশে। দায়িত্বশীল সব মানুষ খুবই মন্দ, নানাবিধ দোষ তাঁদের—এসব বললে শোনা হয় মন দিয়ে। মন ডুবিয়ে শুনি, দেখি, তার অর্থ দ্রুত বিশ্বাসও করে ফেলি।

অমুক মানুষটা খারাপ—এটা শোনামাত্র মন সায় দেয়, হ‍্যাঁ, খারাপ। ভালো বললে মনে উত্তেজনা, উৎসাহ জাগে না। মনে হয় না, আর একটু শুনি। ক্লান্ত লাগে, গা ম‍্যাজম‍্যাজ করে। মন্দ হচ্ছে আমাদের জন্য উত্তেজনাকর, অনুপ্রেরণা ও বিনোদনে পূর্ণ মহৌষধ।

মনে বহুকাল ধরে নানা অসন্তোষ, অপ্রাপ্তির হতাশা জমে আছে। সদা উদ্বেগ, আশঙ্কা আর হতাশা জমে থাকা মন মন্দ ঘটনা গিলতে পছন্দ করে। পছন্দ করে মানুষ সম্পর্কে মন্দ কথা শুনতে ও বিশ্বাস করতে।

রোজ আমরা সাবধান, সচেতন থাকি—লবণ যেন বেশি খাওয়া না হয়। মিষ্টি খেতে ভালো লাগে অনেকের, কিন্তু বেশি খাওয়া ক্ষতিকর ভেবে কম খাওয়ার ব‍্যাপারে সচেতন থাকি। একইভাবে মানুষ যদি রোজই মন্দের চর্চাতে অনেকটা সময় কাটায়, তা-ও নিশ্চয় শরীর ও মনের জন্য অত‍্যন্ত ক্ষতিকর।

আমরা অতি আগ্রহ নিয়ে প্রায় প্রত‍্যহই যা শুনি এবং দেখে থাকি, সবই কি দেশপ্রেমের তাড়নায় দেখি, শুনি? উত্তর হচ্ছে—না। উদ্বেগ বাড়াতে পারার মতো ঘটনার প্রতি, মসলাদার মন্দের প্রতি আমাদের অতি আকর্ষণ। যে মানুষ যত সংকটের কথা বলতে পারবে, তাকে তত যোগ‍্য মনে হয়। যে বেশি বিরক্ত, ক্রুদ্ধ ও অন‍্যের প্রতি অবমাননাসূচক বাক‍্যবাণ নিক্ষেপ করতে পারে, সে মানুষকেই সাহসী, মহান ও কৃতী বলে মনে হয়।

যদি ভালো কথার প্রতি টান থাকত, ভালো বিষয়ের প্রতি যদি আগ্রহ, আকর্ষণ থাকত, এত বেশি রাজনীতি নিয়ে কচলাকচলি হতো না। পরিস্থিতি দেখেশুনে মনে হয়, এ দেশের মানুষ তরকারির বদলে রাজনীতি মেখে ভাত খায়। গ্লাসভর্তি রাজনীতি পান করে, ঘুমায় রাজনীতির বিছানা-বালিশে।

তা যদি হবে, দেশজুড়ে জমিতে ফসল ফলায় কারা? সন্তানদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে কারা? অসুস্থদের চিকিৎসাদান, বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিদেশে গিয়ে জান কয়লা করা রোজগারের টাকা দেশে পাঠানো, নিজেরা আধা পেট খেয়ে দেশকে সম্ভাবনাময় বানানো ইত‍্যাদি মহান কর্ম ভূত এসে করে দিয়ে যায় না।

অন্ধকার কেটে কেটে আলোর পথ খুঁজে বের করে লেখক, শিল্পী, সৃজনশীল মানুষেরা। স্বপ্নবাজ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সামনে হোঁচট খাওয়া পথ, তবু তারা পথ বদলায় না। প্রত‍্যন্ত অঞ্চলে বাস করা কোনো মেয়ে দেশসেরা ফুটবলার হবে স্বপ্ন দেখে। গ্রাম, সমাজ, পরিবার—সবাই মেয়ের এ ইচ্ছাকে অসভ‍্যতা, বেলেল্লাপনা বিবেচনা করে। সবকিছুই বিরুদ্ধে, তবু স্বপ্ন থেকে বিচ‍্যুত হয় না অবহেলায়, অসহায়ত্বে বেড়ে ওঠা সাধারণ সে মেয়ে বা মেয়েরা।

প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে একদিন তারা অসাধারণত্ব প্রদর্শন করে দেশকে গর্বিত বানায়। দেশের মানুষ বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদের কলায়, কৃতিত্বে মুগ্ধ, বিস্মিত হয়। পৃথিবী অবাক হয়ে বাংলাদেশের গুণ গায়।

আমরা প্রত‍্যহ থাকি পরচর্চা, পরনিন্দা নিয়ে। রাজনীতি, পরনিন্দা আর অসভ্যতা লালন-পালন করে এবং বলে—দেশ ও মানুষের ভালো চায়। আমরা অন‍্য ঘরানার নই, রয়েছি একই ঘোরের মধ‍্যে। মনপ্রাণ ভরে শুনতে চাই—মন্দ কথা, পরচর্চা, পরনিন্দা এবং মনে করি, এভাবেই দেশের ভালো হবে।

অসভ্যতায় ‘তা’ দিয়ে দিয়ে আশা করে বসে আছি, সুন্দর কিছু ফুটবে। কাকের বাসায় কোকিল ডিম পেড়ে যায়, কোকিলের ডিম থেকে কি কাকের বাচ্চা ফোটে? তেমনি, যতই আশা করে বসে থাকি, দিন বা ভাগ্য—কোনোটাই বদলাবে না। অসভ‍্যতার ডিম্ব থেকে ফুটে বের হবে নতুন অসভ‍্যতার বাচ্চাকাচ্চা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত