Ajker Patrika

রক্তাক্ত জুলাই

তাইবার কান্নায় এখনো ভেজে বাবার ছবি

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, কামারখন্দ (সিরাজগঞ্জ) 
আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৫, ০৮: ৪৯
জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ইয়াহিয়া আলীর ছবি হাতে মায়ের পাশে দুই শিশুসন্তান। ছবি: আজকের পত্রিকা
জুলাই আন্দোলনে গুলিতে নিহত ইয়াহিয়া আলীর ছবি হাতে মায়ের পাশে দুই শিশুসন্তান। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘মাদ্রাসা থেকে ফিরলেই বাবা কোলে তুলে নিত, আদর করত, টাকা দিত। রাতে বাবার গা ঘেঁষে ঘুমাতাম। এখন আর কেউ আমাকে বাবার মতো আদর করে না। বাবাকে অনেক মিস করি।’ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলো বলছিল সাত বছরের তাইবা খাতুন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাঁর বাবা ইয়াহিয়া আলী।

৪ আগস্ট সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ইয়াহিয়া আলী প্রতিবেশীদের বলেছিলেন, ‘ভালো করে দেখে নিন, দেশ স্বাধীন করতে যাচ্ছি। এটাই হয়তো শেষ দেখা।’ এর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এনায়েতপুরে পুলিশের হাতে তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর আসে। কিছুক্ষণ পর জানা যায়, তিনি আর বেঁচে নেই।

পেশায় তাঁতশ্রমিক ইয়াহিয়া আলীর গ্রামের বাড়ি শাহজাদপুরের খুকনীর ঝাউপাড়ায়। দুই সন্তানের বাবা ইয়াহিয়া ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ১৩ বছরের ছেলে সালমান ফারসী ঢাকার উত্তরার খাদেমুল কোরআন ওয়া সুন্নাহ মাদ্রাসার ছাত্র। আর মেয়ে তাইবা খাতুন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী।

ইয়াহিয়ার ছেলে সালমান বলে, ‘তাইবা শুধু বাবার কাছে যেতে চায়। মা তখন বাবার ছবি হাতে দেয়। ছবি দেখলেই ও জড়িয়ে ধরে কাঁদে।’ কথা বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে সালমানের। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘বাবা ছিলেন আমাদের আশ্রয়। এখন শুধু স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি।’

ইয়াহিয়ার স্ত্রী শাহানা খাতুন বলেন, ‘স্বামীর আয়ে সংসার চলত। তিনি মেয়েকে ডাক্তার আর ছেলেকে আলেম বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন।’

ইয়াহিয়া আলী শহীদ হওয়ার পরদিনই ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। সারা দেশের রাজপথে তখন লাখ লাখ মানুষের উচ্ছ্বাস। একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তাঁদের চোখ-মুখে। তবে সেই কাঙ্ক্ষিত বিজয় দেখে যেতে পারেননি ইয়াহিয়া। এখন সন্তানেরা যেন তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, এটিই চাওয়া স্ত্রী শাহানা খাতুনের। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন সরকার বা আগামী যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তারা যেন আমার পরিবারটাকে দেখে। আমি চাই, আমার সন্তানেরা যেন মানুষ হয়। মেয়েটা যেন একদিন ডাক্তার হয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।’

এনায়েতপুর থানা যুবদলের সদস্যসচিব সাইদুল ইসলাম রাজ বলেন, ‘সেদিন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে ছিলাম। থানা এলাকায় অবস্থানকালে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে দুই হাজারের বেশি আন্দোলনকারী আহত হন। কারও হাতে, কারও পায়ে, আবার কারও বুকে গুলি করে পুলিশ। ইয়াহিয়াকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।’

সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় আন্দোলন আরও তীব্র হয়। মানুষ হাতে লাঠিসোঁটা ও মাথায় পতাকা নিয়ে থানার দিকে এগিয়ে যায়। পরে থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত