Ajker Patrika

গণপিটুনিতে শ্বশুর-জামাইয়ের মৃত্যু: যে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দুষছেন স্থানীয়রা

শিপুল ইসলাম, রংপুর 
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৫, ০৯: ২৫
ভিড়ের মধ্যে দুই হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি জানান গণপিটুনির শিকার রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল। ছবি: আজকের পত্রিকা
ভিড়ের মধ্যে দুই হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি জানান গণপিটুনির শিকার রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল। ছবি: আজকের পত্রিকা

রংপুরের তারাগঞ্জে গণপিটুনিতে শ্বশুর রূপলাল দাস (৪৫) ও জামাই প্রদীপ লালের (৩৫) প্রাণহানির পেছনে আইনশৃঙ্খলাহীনতাকে দুষছেন স্থানীয় লোকজন। তাঁরা বলছেন, গত কয়েক দিনের চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট অপরাধের কারণে স্থানীয় জনতার ভেতর মবের মনোভাব তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশও সেভাবে তৎপর নয়। এসব কারণেই শ্বশুর-জামাইয়ের এমন করুণ পরিণতি ঠেকানো যায়নি।

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত রোববার অজ্ঞাতনামা ৭০০ জনকে আসামি করে তারাগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। এ মামলায় গতকাল সোমবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিরাপত্তাহীনতায় বেড়েছে ক্ষোভ, মব-মনোভাব

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র বলেছে, উপজেলার সয়ার ইউনিয়নের দোলাপাড়া গ্রামে গত ২৫ জুলাই রাতে গোলাম মোস্তফার পরিবারের সদস্যদের বেঁধে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে যায় ডাকাতেরা। এর পরপরই ২৮ জুলাই বকশিপাড়া গ্রামের সফিকুল ইসলামের পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলে ইরফান বাবুকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা ভ্যান নিয়ে যায়। ২ আগস্ট দীঘলটারী গ্রামের মফিজার রহমানের তিনটি ও পাটোয়ারী পাড়া গ্রামের হুমায়ন আহমেদের দুটি গরু চুরি হয়। এর আগেও ওই এলাকা থেকে কয়েক দফায় অচেতন করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্থানীয় লোকজন। ৩ আগস্ট থেকে চোর ধরতে এলাকাবাসী রাত জেগে পাহারা শুরু করেন।

কাজীরহাট-বুড়িরহাট-তারাগঞ্জ সড়কের বটতলা এলাকায় গত শনিবার রাত ৯টায় অবস্থান করছিলেন কয়েকজন যুবক। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন রূপলাল দাসের ভাগিনা জামাই মিঠাপুকুরের ছড়ান বালুয়া এলাকার প্রদীপ লাল। সে পথ ভুলে যাওয়ায় তাঁকে এগিয়ে আনতে যান রূপলাল।

শ্বশুর-জামাই মিলে রোববার তাঁর মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক করার কথা ছিল। এ জন্য বাড়িতে উৎসবে খাওয়ার জন্য প্রদীপ লাল তাঁর ভ্যানে একটি বস্তায় ছোট ছোট স্পিরিটের খালি বোতলে বাংলা মদ (তাড়ি) ভরে আনেন। বটতলা এলাকায় পৌঁছালে ওই যুবকেরা তাঁদের পথ রোধ করেন।

নিহত রূপলালের ছেলে জয় দাসের অভিযোগ, উৎসবে তাঁরা বাংলা মদ খান। শ্যালিকার বিয়ে উপলক্ষে প্রদীপ লাল ছোট বোতলে করে সেগুলো নিয়ে আসছিলেন। বটতলায় তাঁর বাবা ও দুলা ভাইকে আল-আমিন, এবাদতসহ কয়েকজন আটক করে সেই বোতলগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে পথচারীরা জড়ো হন। তিনি বলেন, ‘লোকজন জড়ো হলে তারা বাবা আর দুলাভাইকে চোর বলে। আর বলে, এরাই কয়েক দিন আগে শিশুর গলা কেটে হত্যা করে ভ্যান ছিনতাই করেছে। এরপর লোকজন মারধর শুরু করে। পাশের ফরিদাবাদ গ্রামের মেহেদী হাসান বস্তা থেকে বোতল বের করে কাগ না খুলেই নাকে নিয়ে অজ্ঞান হওয়ার অভিনয় করেন। এরপর উত্তেজিত লোকজন বাবা-দুলা ভাইকে মারধর করে মেরে ফেলে।’

বুড়িরহাট এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম বলেন, বটতলা স্থানটি তিন রাস্তার মোড় ও নির্জন এলাকায়। ওই জায়গা অপরাধপ্রবণ। ওই জায়গায় মাদকের হাতবদল হয়। সেখানেই ওই দুজনকে আটক করেছিল স্থানীয় যুবকেরা।

পুলিশ এসে ফিরে যায়

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যখন বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে রূপলাল দাস ও প্রদীপ লালকে নেওয়া হয়, তখনো তাঁরা জীবিত ছিলেন। চোর ধরা পড়েছে খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। এর কিছুক্ষণ পরে বুড়িরহাট বাজারে পুলিশের দুটি ভ্যান আসে। তাঁরা রূপলাল ও প্রদীপকে উদ্ধার না করে ফিরে যায়। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তিনটি গাড়ি পৌঁছায়।

প্রত্যক্ষদর্শী বুড়িরহাট বাজারের সবজি বিক্রেতা খোকন মিয়া বলেন, ‘জনগণ দৌড়াচ্ছে। শুনলাম চোর ধরা পড়ছে। এর কিছুক্ষণ পর দুইটা পুলিশের গাড়ি আসে। কিন্তু অনেক লোক দেখে তারা ফেরত যায়। আবার ঘণ্টাখানেক পর পুলিশ, সেনাবাহিনীর তিনটা গাড়ি আসে। তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী দামোদরপুর পণ্ডিতপাড়ার ভ্যানচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের মাঠে যায়া দেখি ওই দুজনকে ভ্যানচোরা হিসেবে পাবলিকেরা ডাংগায়ছে। পরে পুলিশ আসি বাঁশি ফুকায় কিন্তু জনগণ সারে না। আবার তারা চলি যায়।’

বুড়িরহাট বাজারে কথা হলে সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুল হামিদ বলেন, ‘প্রশাসন কিসের জন্য? পুলিশ আসছিল, লোকগুলাক সেফ (রক্ষা) করবে না? কিন্তু পুলিশ আসিয়া দেখিয়া ঘুরি যায়। যখনে লোকগুলা পুলিশের কথা শুনছে, লোকগুলা নাকি উঠি বসছে। পুলিশ চাইলে লোক দুইটাক বাঁচার পারত।’ তিনি বলেন, এলাকায় চুরি-ডাকাতি বেড়েছে। গত মাসের শেষে ইরফান নামের একজনকে গলা কেটে হত্যার পর মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছিল, যার বহিঃপ্রকাশ শনিবারের ঘটনা।

জানতে চাইলে তারাগঞ্জ থানার ওসি এম এ ফারুক বলেন, ‘থানা থেকে বুড়িরহাট অনেক দূর। যখন মব তৈরি হয়, তখন স্কুল মাঠে তিন-চার হাজার লোক। তাদের ডিঙিয়ে ওদের সেফ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়নি আসলে।’

হাতজোড় করে বাঁচার আকুতি

রংপুরের তারাগঞ্জে গণপিটুনির শিকার রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। হাতজোড় করে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে রূপলাল বলেছিলেন, ‘আমি চোর না, ডাকাত না।’ তবু শেষ রক্ষা হয়নি রূপলাল ও প্রদীপের। তাঁদের সেই মর্মস্পর্শী আকুতির ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা দেখে অনেকে শিউরে উঠছে।

ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয় কয়েকজন বটতলা এলাকায় ভ্যান থামিয়ে রূপলাল ও প্রদীপকে আটক করে। ভ্যান থেকে বের করা হয় একটি প্লাস্টিকের বস্তা। নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তাঁরা চুপ ছিলেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে কয়েকজন তাঁদের মারতে যায়। কিন্তু মেহেদী হাসান নামের এক যুবক মারধরে বাধা দেন এবং পুলিশে খবর দেওয়ার কথা বলেন। এ সময় রূপলাল উত্তর দেন, ‘আমি চোর না, ডাকাতও না। মুচি, তারাগঞ্জ বাজারে জুতা সেলাই করি।’ কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কেউ উচ্চ স্বরে বলে ওঠে, ‘তুই চোর-ডাকাইতের বাপ।’ এ সময় রূপলাল প্রস্রাবের কথা বললেও পালিয়ে যাবেন ভেবে তাঁকে সুযোগ দেয়নি উত্তেজিত জনতা। হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, আর ভ্যানের ওপরে বসা প্রদীপকে লক্ষ্য করে লোকজন বলতে থাকে, ‘মাল খেয়ে আসছে; অভিনয় করছে।’

এ সময় ভ্যানে থাকা বস্তা থেকে প্লাস্টিকের বোতল বের করে নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোঁকেন মেহেদী হাসান। কিছুক্ষণ পর তিনি ‘এ ভাই, দয়া করে আমাকে ধরো’ বলে মাটিতে পড়ে যান। দুজন তাঁকে ধরে সরিয়ে নেন। তখন ক্ষুব্ধ জনতা রূপলাল ও প্রদীপকে মারধর শুরু করে।

পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ দুজনকে উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসক রূপলালকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত প্রদীপকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ভোর ৪টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রূপলালের লাশ বাড়িতে এলে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

বুড়িরহাট গ্রামের আব্দুল হাকিম বলেন, ‘রাত আনুমানিক ৯টার দিকে খবর পাই, অজ্ঞান করে ভ্যান ছিনতাই করা চোর ধরা পড়েছে। গিয়ে দেখি, শত শত মানুষের ভিড়। পরে একটা ভিডিওতে দেখি, ওই দুজন হাতজোড় করছিল বাঁচার জন্য। কিন্তু তাদের কথা শোনেনি।’

নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজন হলেন সয়ার ইউনিয়নের বালাপুর এলাকার এবাদত হোসেন (২৭), বুড়িরহাট এলাকার আক্তারুল ইসলাম (৪৫) ও রফিকুল ইসলাম (৩৩) এবং রহিমাপুরের মিজানুর রহমান (২২)। এর আগে রোববার দুপুরে তারাগঞ্জ থানায় মামলা করেন নিহত রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৭০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তারাগঞ্জ থানার ওসি এম এ ফারুক বলেন, চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এবাদত মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তাঁর ও অন্যান্য আসামির তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত